
লেখক হোসেন মনির:
ভূমিকাঃ ভূমিষ্ঠ হওয়া মহান আল্লাহর এক অমোঘ নিয়ম।মহান সৃষ্টিকর্তার সাথে বান্দার পরিচয়ের এই প্রথম জাগতিক পর্বে যত আয়োজন রয়েছে তারমধ্যে একজন ডাঃ এর সংশ্লিষ্টতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়। কিন্ত এই স্মরণীয়া সবার কাছে অনেক ক্ষেত্রে সুখকর হয় না,হয় না বরণীয়ও। একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে বলার প্রয়োজনবোধ করছি না একজন পিতামাতার ভূমিকা কিন্তু সন্তানের পৃথিবীতে আগমনের-একটি দেশের সুনাগরিক সৃষ্টিতে একজন ডাক্তার থেকে নার্স, আয়া, ডাক্তারের কাছে সাক্ষাতের সিরিয়াল মেইনটেইনকারী এমনকি হাসপাতাল ক্লিনিকের পরিচ্ছন্নতা কর্মী- দারোয়ান অথবা ক্লিনিক বা হাসপাতালের মালিকের ভূমিকা অপরিসীম ও পবিত্র। এই পবিত্র হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো হলো অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠান থেকে সেরা সফট কর্ণার কিন্তু এই পবিত্র প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশই যতসব ধোঁকাবাজদের ইতরতা-অসভ্যতা-অভদ্রতা-অদূরদর্শীতা ও অকৃতজ্ঞতায়পূর্ণ যেন কঠিন শিলায় স্তুপকৃত হৃদয়ের মানুষগুলো এই সেক্টরকে ঘীরে রেখেছে।
(১) বড় আপন প্রয়োজনে গিয়েছিলাম নারায়ণগঞ্জ শহরের মডার্ণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এটি বাংলাদেশ জুট এ্যাসোসিয়েশন এর বিল্ডিং এ অবস্থিত। সম্মূখে একটি বাগান এবং নারায়ণগঞ্জ শহরের সবচেয়ে দীর্ঘ গাছপালা এখানেই বলে মনে হলো তবে ধুলোবালি মশামাছি আর রিসিপশনের কিছু লোকের মাছের বাজারের মতো চিল্লাচিল্লি যতটা না অবাক করেছে তারচেয়ে বেশী অবাক করেছে ডাঃ মিনারা সিকদারের মতোন খ্যাতিমান চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পেতে বিকেল ৫ টা থেকে রাত প্রায় ১১টার মধ্যেও রোগীরা তাঁদের অভিভাবক ও সন্তানদের নিয়ে অপেক্ষা করেন এসিহীন কখনও এসির গরম বাতাশের ও বিভিন্ন রোগীদের নিঃশ্বাস-দীর্ঘনিঃশ্বাসের ভ্যাপসা গরমে- অক্সিজেন অপ্রতুলতায় কাতর হয়ে! এখানে একজন মা রোগীর সাথে বা তাঁর গর্ভে তাঁর আগত সন্তান! ভাবতে অবাক লাগে! বিস্ময়ের সাথে নীরব মনে প্রশ্ন জাগে যে,”এই প্রতিষ্ঠানের চতুষ্পদী মস্তিষ্কের উঠোন মাড়িয়ে কেন মায়েরা তাঁর গর্ভের সন্তান নিয়ে যান ডাঃ মিনারা সিকদারের কাছে?
(২) পর্যবেক্ষনে দেখা গেছে একটি গর্ভবতী নারী ও তাঁর অভিভাবকরা যদি ডাঃ মিনারা সিকদারের কাছে যান তাহলে তাঁকে মডার্ণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অন্তত ৩ থেকে ৫ বারের বা তারচেয়ে কমবেশি যেতে হয় এবং অবস্থার প্রয়োজনে সিজারে রোগী উদ্বুদ্ধ হলে ডাঃ মিনারা সিকদারের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হলে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে সিটি লাইফ হা।স।পা।তা।লে ভর্তি হতে হয়। তুলনামূলকভাবে সিটি লাইফ হা।স।পা।তা।ল আলোক সজ্জা,রং,গ্লাস ও এ্যালুমিনিয়াম ফিটিংসয়ে এগিয়ে থাকলেও গো-মস্তিষ্ক থেকে বেঁচে থাকতে পারিনি আমরা গো-বেচারারা!
সিটিলাইফ হা।স।পা।তা।লে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, “সেবা নিতে আসিনি যেন সেবা দিতে এসেছি”! নার্সদের ঢিলেমি ও ঘুম দেখে একটি গান প্রায়শই মনে হয়ে যেতো যা বিখ্যাত বাংলা গানের শিল্পী ড.অনুপ ঘোষাল এবং রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে জনপ্রিয় বাংলা আধুনিক গান “জাগিতে এসেছি রাতি” প্রণব রায়ের লেখা এবং কমল দাশগুপ্তের সুরে একটি কালজয়ী গান। এই বিষাদমাখা গানটি জাগরণ, স্মৃতি এবং বিরহের অনুভূতি নিয়ে রচিত।গানটি হলো, “জাগিতে এসেছি রাতি
শুধু জাগিতে এসেছি রাতি।
জাগাতে আসিনি গো,
আমি নহি তব মিলন বাসর সাথী……
সিটি লাইফ কথিত হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার প্রাঙ্গনে যেনো বিস্ময়ের দরজাগুলো খোলে! জীবনের শ্রেষ্ঠ অপেক্ষার পরমযত্ন ও আবেগমাখা অনুভূতির লগ্নে যখন উচ্ছ্বাসের-উদ্বেগের পাহাড়সমান ওজনচাপে পেলবতার তৃপ্তি বুকের ধন আসবে বুকে আমি দাঁড়িয়ে আছি দুরুদুরু বুকে যেনো এটি একটি আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট! হঠাৎ করে ডাকা হলো উমুকের লোকজন কই? বড় ভাইয়ের বউ দৌড়ে গেলো নার্স কাউন্টারে। সেখানে বলা হলো বাচ্চার নাভীতে ইনজেকশন ও মুখে ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে ৫০০ টাকা দেন! দেয়া হলো। এরপর আবার বলা উমুকের লোকজন কই? জ্বি আমরা, সাথে সাথে অপারেশন গেট থেকে দুজন নার্স সদ্য সিজার করা বাচ্চাটি হাতে তুলে দিয়ে বললো আমাদের বকশিস দেন। ৫০০ দেয়া হলে তারা জানান যে,আমরা অনেকজন ৫০০ টাকায় হবে না! এখানে একটি নিরাপত্তার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, এ বাচ্চা আমার এটা তারা কিভাবে আইডেনটিটি করছে? এই নার্সদের সাথে আগে কোন সাক্ষাৎই হয়নি! অতএব এই বাচ্চা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় যিনি অপারেশনের আগে স্বাক্ষর করছেন বা রুগীর একজনের বা দুজনের ছবি থাকতে হবে এবং বুঝে পেয়েছি তার সাক্ষর ও নেয়া যেতে পারলে বোধ হয় ভালো হতো।
(৩) কেবিনে আসার পর আশেপাশের কেবিনের দরজা খোলার বিকট শব্দ ও নানান বয়স ও ধরনের মানুষের আনাগোনা আয়া নার্সদের গলাফাটানো উচ্চশব্দে রীতিমতো তামিল জাতীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। সিটিলাইফ হা।স।পা।তা।ল লেখতে যতোটা না কৌশল করা হয়েছে-তারচেয়ে বেশী কৌশল হচ্ছে, ডাক্তার কর্তৃক রোগীদের ওষুধ ব্যাবস্থাপত্রের হুবহু ওষুধ অন্য একটি সাদা কাগজে লিখে নার্সরা ফার্মেসীতে পাঠাচ্ছে ওষুধ কিনতে! এখানে কমিশন বানিজ্যের কৌশল! আয়া তিন শিফটে তিন দিন কেবিন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করবেন তাকে ফিক্সড ১৫০ টাকা দিতে হবে-নার্সদের তিন শিফটে ৫০০ করে ১৫০০ শত টাকা। শেষ দিনে একটি প্রেসক্রিপশন হাতে ধরিয়ে নার্স বলছেন একটি নোট ছাড়া যাওয়ার আগে নাকি কোন কথা নেই! এই হাসপাতাল নয় সিটি লাইফ হা।স।পা।তা।ল থেকে বের হবার সময় সিকিউরিটি গার্ডের মুখাবয়ব দেখে আমার কান্নাই পাচ্ছিলো যেন তাকে কেউ দেখে না! আমি গিয়ে মিশুক ঠিক করলাম ব্যাগগুলো তুললাম,এবার রোগী নিয়ে উঠছি আমি আগেই বলেছি ড্রাইভার সাহেবকে যে, খুবি ধীরে যেতে হবে তবুও সিকিউরিটির হাঁকডাক সাবধানে যাবেন ড্রাইভার। বিশাল একটি গেট ছেড়ে সিকিউরিটি সরেও ভদ্রলোক এখন আমার পাশেই! তাকেও কি আয়া নার্সদের মতো ফিক্সড খুশি করতে হবে? হ্যাঁ তাই হলো!
সিটি লাইফ ৪ থেকে ৫ম তলা সহ জরুরি বহির্গমন চিহ্ন চোখে পড়েনি,ফায়ার এক্সটিংগুইসার রয়েছে সাড়ে পাঁচ ফিট উঁচুতে।ইমারজেন্সিতে রয়েছে হাউজকিপিং এর সরঞ্জামের বাঁধা। আছে মশার উপদ্রব ও মশার বংশবৃদ্ধির সহায়ক এসির পানি ও মেডিকেল বর্জ্যের স্তুপ। আছে আশেপাশের বিল্ডিং এর ছাদে পঁচা পানিতে বোতল প্লাস্টিকের মশাদের সুইমিংপুলও যা কর্তৃপক্ষ, রোগী বা কোন ভিজিটরদের চোখ ফাঁকি দেবার জন্য প্লাস্টিকের জালি জানালায় এঁটে দিয়েছে!
সিটি লাইফ কর্তৃপক্ষ অনেক কৌশলী হলেও অভ্যন্তরে আস্তে কথা বলা,রোগীদের সাক্ষাৎকারীদের সংখ্যা ও সময় এবং পরিচ্ছন্নতার ওপর আরো জোর দিতে তেমন কৌশলগত সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় যে, কোন রোগীর অপারেশন কত টাকায় হবে তা রোগীর অভিভাবকদের বসার জায়গা বসে দরকষাকষি করেন এখানকার তৃতীয় শ্রেণীর স্টাফ তাও উচ্চশব্দে! আবার অনেকেই জানেন না কেবিনের মূল্য ঠিক করতে হবে ডাক্তারদপর সাথেই! অনেক মানবিক দৃষ্টি আকর্ষণকরা বাণী চেম্বার থেকে শুরু করে হা।স।পা।তা।লে দেখা যায় যে বাণীগুলো একজন রোগী বা সাধারণ মানুষ যেন আরেকজন রোগীকে অনুভব করতে পারেন কিন্তু ডাক্তার নার্স চেম্বার বা হা।স।পা।তা।লের অন্যান্য কর্মচারীরা যেন রোগীদের মানুষ মনে করেন এবং তারাও একদিন রোগী হবেন-একথা অনুভব করানোর কোন বাণী চোখে দেখা যায় না!
উপসংহারে,”এই শহরে একজন ডাক্তার মিনারা সিকদার ” আছেন- যাঁর কাছে সেবা পেতে একজন রোগী ও তাঁর অভিভাবকরা কেন মশা-মাছি, ধুলোবালি,ভ্যাপসা গরম,অহেতুক উচ্চশব্দ,বাড়তি ফিক্সড বকশিস,ওষুধ বানিজ্য, বহির্গমন পলিসিহীন,মশা-মাছি বংশবৃদ্ধির সুযোগ থাকা সমুহবিপদ উচ্চমূল্যের কথা জেনেও কেন আসেন? উত্তরটি যা পেয়েছি এবং দেখেছি তা হলো,
“শুধুমাত্র চিকিৎসায় বিশ্বাস-আস্থায় “।
“এই শহরে একজন ডাঃ মিনারা সিকদার”কে যারা ধারন করেন যারা তাঁকে নিয়ে আখের গোছাচ্ছেন,কামিয়ে নিচ্ছেন,সংসার চালাচ্ছে,বানিজ্য করছেন,নাম কামাচ্ছেন তারাঁ যেন এই শহরের একজন ডাক্তার মিনারা সিকদারকে অনুভব করার চেষ্টা করেন যেন তাঁর প্রতিষ্ঠান ও তাঁর সেবা নিয়ে কোন প্রশ্ন না ওঠে, কারন তিনি সবার।