
নিজস্ব প্রতিবেদক | বর্তমান নিউজ
একটি রেডিও কিনতে কেউ কি সত্যিই পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করতে পারেন? আর সেটি চালানোর ব্যাটারি কিনতে আরও এক বিঘা?
আজকের দিনে কথাটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯৬৫ সালে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার রহিমাবাদ গ্রামের দেলোয়ার হোসেন মিঞার কাছে তা ছিল না পাগলামি—ছিল স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার সাধ।
সে সময় মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন ছিল না। ইচ্ছে হলেই গান শোনা বা দেশ-বিদেশের খবর জানার সুযোগও ছিল না। গোটা গ্রামের কাছে বাইরের পৃথিবীর জানালা ছিল একটি যন্ত্র—রেডিও। তা থেকে ভেসে আসত গান, খবর; শোনা যেত দূরের পৃথিবীর কথা।
সেই গান আর খবর শোনার নেশাতেই দেলোয়ার হোসেন বিক্রি করেন পাঁচ বিঘা পৈতৃক জমি। সেই টাকায় ঘরে আনেন জাপানের তৈরি একটি রেডিও। তবে রেডিও কিনলেই তো চলে না, চালাতে লাগে ব্যাটারি। সেই ব্যাটারির খরচ জোগাতে বিক্রি করতে হয় আরও এক বিঘা জমি। সব মিলিয়ে রেডিও আর তার ব্যাটারির জন্য যায় ছয় বিঘা জমি।
রেডিওটি ছিল জাপানের নিপ্পন ইলেকট্রিক কোম্পানির—এনইসি (NEC) তৈরি। আজও যন্ত্রটির গায়ে দেখা যায় সেই নাম। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো জাপানের তৈরি রেডিওটি সমুদ্র ও মহাদেশ পেরিয়ে পৌঁছেছিল সিরাজগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রামে।
রেডিওটি ঘিরে দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি হয়ে উঠেছিল এলাকার মানুষের মিলনস্থল। আশপাশের গ্রাম থেকে শত শত মানুষ আসতেন গান ও খবর শুনতে। একটিমাত্র যন্ত্রকে ঘিরে জমত আড্ডা, তৈরি হতো মুগ্ধতা আর আনন্দের মুহূর্ত।
কিন্তু আনন্দের সেই গল্পে একসময় নেমে আসে অভাবের ছায়া। সময়ের সঙ্গে দেলোয়ার হোসেন তাঁর পৈতৃক ২৬ বিঘা জমি অল্প অল্প করে বিক্রি করেন। ১৯৬৯ সালে বিক্রি করতে হয় মাথা গোঁজার বসতবাড়িটুকুও। সবশেষে, ১৯৭২ সালে বিক্রি হয়ে যায় তাঁর প্রিয় রেডিওটিও।
দাম ছিল মাত্র ১৮০ টাকা।
যে রেডিও ঘরে আনতে পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছিল, অভাবের সময় সেটিই হাতছাড়া হয় মাত্র ১৮০ টাকায়। শখ আর বাস্তবতার দূরত্ব কতটা নির্মম হতে পারে, দেলোয়ার হোসেনের জীবনের এই ঘটনা তারই এক করুণ উদাহরণ।
২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দেলোয়ার হোসেন মারা যান। কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি। বাবার মৃত্যুর আট বছর পর, ২০২২ সালে, ছেলে আলতাফ হোসেন খুঁজে পান সেই হারিয়ে যাওয়া রেডিওটি। বাবার শেষ স্মৃতি হিসেবে দীর্ঘ ৫০ বছর পর সেটি আবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন তিনি।
রেডিওটি ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের মানুষ আবারও ভিড় করেন। তবে এবার গান বা খবর শুনতে নয়—অতীতের সেই শখের জিনিসটি একনজর দেখতে। রেডিও ঘরে ফিরেছিল, কিন্তু তার কণ্ঠ আর ফেরেনি।
কারণ, সেটি চালাতে একসঙ্গে দরকার ছিল আটটি বড় ব্যাটারি। সেগুলো কিনতে লাগত প্রায় ৪০০ টাকা—যে সামর্থ্য তখন আলতাফ হোসেনের ছিল না।
এখানেই গল্পটি বুকের ভেতর চাপা দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকে। যে রেডিও কিনতে একদিন বিঘার পর বিঘা জমি বিক্রি হয়েছিল, অর্ধশতাব্দী পর সেটি চালানোর ব্যাটারির টাকাও জোগাড় করা যায়নি।
‘শখের তোলা আশি টাকা’—কথাটা মুখে বলতে ছোট। কিন্তু দেলোয়ার হোসেনের জীবনে সেই শখের গল্প ছিল অনেক বড়, অনেক গভীর। আর তার শেষটা—বিষণ্ন, নিঃশব্দ।