
নিজস্ব প্রতিবেদক | বর্তমান নিউজ
বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি। পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ। ছেলের মৃত্যু আত্মহত্যা বলে মনে করেন না বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তাঁর সন্দেহ, তাহসিফকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে কারা বা কী কারণে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব কথা বলেন এনায়েতুল করিম।
তিনি জানান, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর তাহসিফের এক বন্ধু বাসায় এসে তাঁকে ডাকেন। মাকে নিচে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে আসার কথা জানিয়ে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাহসিফের কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল কি না—এমন প্রশ্নে তাঁর বাবা বলেন, ছেলে ভদ্র ও সামাজিক ছিলেন। কারও সঙ্গে ঝগড়া বা বিরোধ ছিল বলে তিনি জানেন না। চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ায় ছেলের কিছুটা মন খারাপ থাকতে পারে, তবে এ নিয়ে বড় কোনো সমস্যা ছিল বলে তাঁর মনে হয় না।
ছেলের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মনে করেন না জানিয়ে এনায়েতুল করিম বলেন, তাহসিফ প্রাণবন্ত ছিলেন এবং বিমানবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হতে অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ; ছেলে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়ও ভাগ করে নিতেন। তাঁর বিশ্বাস, তাহসিফ আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তাহসিফের কর্মজীবন সম্পর্কে বাবা জানান, তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজের সঙ্গে কাজ করেছেন। সবশেষে ভার্গ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কয়েক দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় বিশ্রামে ছিলেন তিনি।
ঘটনার দিন তাহসিফ মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন এবং বাবার জন্যও কিছু কিনেছিলেন বলে জানান এনায়েতুল করিম। এরপর দ্বীপ নামে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে নিচে যাওয়ার কথা বলে বের হন। তাঁর মা একাধিকবার ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করেও যোগাযোগ করতে পারেননি। রাত ১টার পর তাহসিফ মাকে বার্তা দিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন।
এনায়েতুল করিম বলেন, বুধবার দুপুরে থানায় গিয়ে ছেলের খোঁজ করেছিলেন। তখন পুলিশ কোনো তথ্য পায়নি বলে জানায়। পরে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে পুলিশ ফোন করে তাঁর ও ছেলের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তুরাগ নদে একটি মরদেহ পাওয়ার কথা জানায়। রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকায় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাহসিফ ওই এলাকায় কখনো যেতেন না।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের পর তাহসিফের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। মর্গসংশ্লিষ্ট সূত্র ও মরদেহ নিয়ে আসা নৌ পুলিশের এক সদস্য জানান, বুধবার রাতে একজন স্বজন হাসপাতালে এসেছিলেন, পরে তিনি চলে যান। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিতে স্বজনদের উপস্থিতি নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।
মরদেহবাহী গাড়ির চালক সামিউল বলেন, মালিকের নির্দেশে তিনি মরদেহটি হাসপাতালে এনেছেন। কাজ শেষে মরদেহ আবার গাড়িতে তোলা হয়েছে, সেটি উত্তরায় নিয়ে যাবেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের কেউ তাঁর সঙ্গে নেই বলেও জানান তিনি।
ঢাকা জেলা নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বৃহস্পতিবার জানান, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নৌ পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর দেওয়া হয়। পরে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মরদেহটি উদ্ধার করেন। তাঁর পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতে থাকা ঘড়ি ও পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।