মহানায়িকার বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে হন চরম অপমানিত! গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ১ঘণ্টা, জানেন কেন এমন ঘটেছিল সন্ধ্যা মুখার্জীর সাথে?

নিজস্ব প্রতিবেদন: বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দুইটি অত্যন্ত পরিচিত নাম সুচিত্রা সেন এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তৎকালীন সময়ে সুচিত্রা সেনের প্রায় অনেক ছবিতেই কিন্তু গান গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তবে একবার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে সুচিত্রা সেনের লিপে আমি প্রচুর গান করলেও তার সঙ্গে আমার নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। বেলুড়মঠে ভরত মহারাজের কাছে সুচিত্রা সেন প্রথম নিয়ে গিয়েছিলেন সন্ধ্যা দেবীকে। আসলে ভরত মহারাজ সন্ধ্যা দেবীর গান ভীষণ ভালোবাসতেন।

তাই সুচিত্রা দেবীকে তিনি একদিন এই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কে নিয়ে আসতে বলেন। মহারাজের কথা মহানায়িকার কাছে রীতিমত বেদবাক্যের সমান ছিল। এরপর মিসেস সেন আর সময় নষ্ট না করে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে বেলুড়মঠে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জেনে নেব সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং সুচিত্রা সেনের সম্পর্কের কিছু অজানা ইতিহাস। জানেন কি এত ভালো সম্পর্ক থাকলেও একটা সময় সুচিত্রা সেনের বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে বাধা পেয়েছিলেন সন্ধ্যা দেবী!

এক সাক্ষাৎকারে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, “সুচিত্রা সেন একবার আমাকে ফোন করে বলেন আমার সঙ্গে বেলুড় মঠ চলো। ভারত মহারাজ তোমাকে দেখতে চান”। তখন প্রত্যুত্তরে সন্ধ্যা দেবী জানান, ‘শ্যামল বাবুর সঙ্গে কথা বলে তোমাকে জানাচ্ছি’। শ্যামল গুপ্ত অর্থাৎ অর্থাৎ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী। এই ঘটনার পর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আবার মহানায়িকাকে জানান তিনি শ্যামল বাবুকে সঙ্গে নিয়েই যেতে চান। মিসেস সেন কিন্তু মানা করেননি, রাজি হয়ে যান।

এরপর গাড়ি করে সংসারিক গল্প থেকে শুরু করে নানা ধরনের গল্প করতে করতে বেলুড় মঠ পৌঁছে যান সুচিত্রা সেন এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তবে অভিনয় বা গান নিয়ে কিন্তু তাদের মধ্যে কোন রকমের আলোচনা হয়নি। সাত পাকে বাঁধা ছবির জন্য ১৯৬৩ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। এটি ছিল আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনী যা পরিচালনা করেছিলেন, অজয় কর। এই চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন দেবেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। এই সময় মহানায়িকা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী সম্মান পেলে সন্ধ্যা দেবী তার বাড়িতে তাকে শুভকামনা জানাতে উপস্থিত হন।

এই সময়ে নিউ আলিপুরে থাকতেন সুচিত্রা সেন।এই কথা বলতে গিয়ে পরবর্তীকালে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তিনি জানান, “আমি অনেক ফুল নিয়ে গিয়েছিলাম, সঙ্গে একটি পারফিউমের শিশি। কারুর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমি সেই জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ঐদিন সুচিত্রার বাড়িতে যেতে আমার সামান্য দেরি হয়ে গিয়েছিল।

সুচিত্রা আর ওর স্বামী দিবানাথ সেন দেখলাম যাওয়ার জন্য বাড়ির গেট খুলছেন। সুচিত্রা আমাকে দেখে একটু হেসেই বলল যে সন্ধ্যা দেরি করেছে। এরপর ও আমায় বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। তখন আমি ওর গায়ে ফুল ছড়িয়ে মালা পরিয়ে দিলাম এবং গোটা পারফিউম টা লাগিয়ে দিলাম। তখন সুচিত্রা বলল যে সন্ধ্যা আমাকে একেবারে রানীর মতন করে দিল”।

অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের মেয়ের বিয়ের কিছুদিন পর আবারও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়। মুনমুন অর্থাৎ সুচিত্রা দেবীর মেয়ের সংসার কেমন চলছে সবকিছু জানার পাশাপাশি প্রচুর গল্প হয় সেদিন এমনটাই জানিয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। এরপর যখন মহানায়িকা নিজের বাড়িতে সন্ধ্যা দেবীকে আমন্ত্রণ জানান তখন সন্ধ্যা তাকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি তার মেয়েকে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা! সুচিত্রা সেন জানান অবশ্যই নিয়ে আসার কথা।

১৯৯১ সালের ২২শে নভেম্বর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের তিন থেকে চার দিন আগে সুচিত্রা সেনের বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে গিয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। কিন্তু গেটে ছিল তালা দেওয়া। বাইরে বসে ছিলেন একজন বয়স্ক পাঞ্জাবি দারোয়ান। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সেই দারোয়ানকে তার আসার কারণ জানালে দারোয়ান তাকে জানাই যে এখন মেমসাহাব অর্থাৎ সুচিত্রা দেবী বাড়িতে নেই। বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়া পরে রাস্তার উপরেই কিন্তু তখনও দাঁড়িয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “এই সময় রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে খারাপ লাগছিল। তাই দারোয়ানকে আরো একবার দেখতে বললাম। তখন দারোয়ান জানালো মেমসাহাব এখন পুজো করছেন।

তখন বাধ্য হয়ে আমি দারোয়ানকে বললাম যে তুমি গিয়ে আমার নাম বল। দারোয়ান তালা দিয়ে উপরে চলে গেল। এই ব্যাপারটিতে ভীষণ অপমানিত বোধ করেছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তবে তিনি জানিয়েছেন যে,‘ হয়তো এটাই স্বাভাবিক তাই মনকে শক্ত করে নিয়েছিলাম’। এরপর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এই গল্পের শেষ অংশ জানান। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন,“ এরপর দারোয়ান এসে আমাকে উপরে ডেকে নিয়ে গেল এবং ড্রয়িং রুমে বসিয়ে রাখল। যার প্রতীক্ষায় এতক্ষণ ধরে বসে ছিলাম সে আর আসেনা। হঠাৎ সুচিত্রাকে দেখলাম পায়ে পায়ে ড্রয়িং রুমে এসে ঢুকলো। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। সুচিত্রাকে দেখলাম বুকের উপর একটা কুশাণ চেপে রেখেছে।

সুচিত্রা আমায় বলল তোমায় কে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছে? তখন জানালাম যে তোমার বাড়ির লোকই বসিয়ে রাখলো। তুমি ব্যস্ত ছিলে, পুজো করছিলে তাই। তখন সুচিত্রা জানান যে আমি তো পুজো করিনি। সুটকেস গোছাচ্ছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম কোথাও যাওয়ার কথা আছে কিনা? মিসেস সেন জানান এখনো কিছু ঠিক করেননি তিনি। যদিও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় যাতে অপমানিত বোধ না করেন সেদিন এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তারপর পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে যেখানে তার গাড়ি দাঁড়িয়েছিল ততদূর পর্যন্ত নিজেই চলে এসেছিলেন সুচিত্রা সেন।

মহানায়িকার মনের নাগাল পাওয়া সত্যিই কিন্তু একেবারে মুশকিল। সুচিত্রা সেন এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের এই বন্ধুত্ব তথা রসায়ন কেমন লাগলো আপনাদের অবশ্যই জানাতে ভুলবেন না। বিনোদন জগত সম্পর্কিত সমস্ত ধরনের তথ্য জানতে হলে আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদন গুলির উপর নজর রাখতে থাকুন।

Back to top button