নিজস্ব প্রতিবেদক।বর্তমান নিউজ
যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা আর পড়াশোনায় মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই জীবিকার তাগিদে রাস্তায় বাদাম বিক্রি করতে হতো আট বছর বয়সী শিশু হাসানকে। বাবাকে হারিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে শৈশবেই তাকে নামতে হয়েছিল উপার্জনের পথে। তবে এবার সেই কঠিন বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরুর সুযোগ পেয়েছে হাসান। তার পাশে দাঁড়িয়েছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম।
রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শিশু হাসান ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। এ সময় তিনি পরিবারের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং হাসানের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি শিশুটির স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় নগদ অর্থসহায়তাও প্রদান করেন।
জানা গেছে, হাসানের বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব ও আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এরপর তিন ভাই, এক বোন ও মাকে নিয়ে বারিধারার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতে থাকে আট বছর বয়সী হাসান। পরিবারের অসচ্ছলতা এবং জীবিকার তাগিদে ছোট্ট বয়সেই তাকে বাদাম বিক্রির কাজে যুক্ত হতে হয়।
যে বয়সে তার নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার কথা, সেই বয়সে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে রাস্তায় রাস্তায় বাদাম বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। ফলে স্বাভাবিক শৈশব ও পড়াশোনার সুযোগ থেকে অনেকটাই দূরে সরে যেতে হয়েছিল শিশুটিকে।
হাসানের এমন পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে তাকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে নেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। সেখানে হাসান ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভাব-অনটন এবং জীবনযাপনের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নেন তিনি। পরে হাসানের শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করেন এবং পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। দারিদ্র্য কিংবা পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিশু যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করা সবার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। শিশুর হাতে শ্রমের বোঝা নয়, বই-খাতা তুলে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ শৈশব, শিক্ষার অধিকার ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। হাসানের মতো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক সহায়তা নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একটি দায়িত্বশীল উদ্যোগ। প্রতিটি শিশু যেন নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
জেলা প্রশাসক আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন, কোনো শিশু যেন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে না পড়ে। শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাদের জন্য শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা সমাজের সবার দায়িত্ব।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে নতুন করে আশার আলো দেখছে হাসান ও তার পরিবার। জীবিকার তাগিদে বাদাম বিক্রিতে ব্যস্ত থাকা শিশুটির সামনে এবার খুলে গেল বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার নতুন সুযোগ। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সে।
একটি শিশুর জীবনে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত পরিবর্তন নয়, এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। হাসানের জীবনে এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সমাজের প্রতিটি শিশুরই রয়েছে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার, শিক্ষা গ্রহণের এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের অধিকার। কোনো শিশুর শৈশব যেন অভাবের কারণে হারিয়ে না যায়, সে জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।