নিজস্ব প্রতিবেদক।বর্তমান নিউজ
বাংলাদেশ রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সীমান্ত ব্যাংকের ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। তিনি নিজেই মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে জাল বিল তৈরি করা হয়। পরে ওই বিলের বিপরীতে চেক ইস্যু করে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার ১৪ আসামি
আসামিদের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের অস্থায়ী কর্মচারী মোহাম্মদ হাবিবুল্লা খান (৩৭), সাবেক অডিটর পবন কুমার পালিত (৬১), অডিটর মোহাম্মদ মেহেদী হাসান (৩৫), জুনিয়র অডিটর খোকন চন্দ্র দে (৪৫), হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেন (৪৫), হিসাবরক্ষক সৈয়দ মো. সাইফুর রহমান (৪৪), হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের (৪২) ও অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান (৪০) রয়েছেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল (৪৩), উপকর কর্মকর্তা এম. মনজুর উদ্দিন চৌধুরী (৬১) ও ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন (৬১) এবং সীমান্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. পারভেজ (৩৭), রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া (৪৩) ও তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার (৫৩) মামলার আসামি।
যেভাবে তৈরি হয় ভুয়া বিল
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার একটি ভুয়া বিল তৈরি করা হয়। পরে ওই বিলের বিপরীতে চেক ইস্যু করে অর্থ তুলে নেওয়া হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির কথিত মালিক কোহিনুর আক্তারের নামে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ড থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছিল। তবে লাইসেন্সের আবেদনে দেওয়া ছবির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির মিল পাওয়া যায়নি।
এজাহার অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রকৃত মালিক কোহিনুর আক্তার একজন শ্রমিক। তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং তার নামে কোনো ব্যাংক হিসাব ছিল না। তিনি কখনো সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে যাননি। এমনকি লাইসেন্সে উল্লেখ করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
দুদক কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব অসংগতি যাচাই না করেই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তা ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন।
ওই ট্রেড লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে একটি এসএনডি হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার ফরমে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা হিসাব খোলার সুযোগ করে দেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেলওয়ের ব্যবস্থায় বিল এন্ট্রি ও অনুমোদন
এজাহারে বলা হয়েছে, রেলওয়ের আইবাস++ ব্যবস্থায় ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভুয়া বিলটির টোকেন ও বিল এন্ট্রি করা হয়। এ কাজে রেলওয়ের সাবেক অডিটর পবন কুমার পালিতের পরিচিতি ব্যবহার করা হয়। পরে হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেনের পরিচিতি ব্যবহার করে বিলটি অনুমোদন করা হয়।
তবে বিলটির পক্ষে রেলওয়ের স্টোরস শাখার রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট নথিতে কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দুদক। বিলের স্বাক্ষর, সিল ও অন্যান্য তথ্যেও অসংগতি ছিল।
এরপর ৩১ ডিসেম্বর বিলটির বিপরীতে ১১৩৯০৮৫ নম্বরের একটি চেক ইস্যু করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট হিসাব বিভাগের কর্মকর্তারা মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই না করেই চেকটি অনুমোদন করেন।
পরে রেলওয়ের অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমানের মাধ্যমে চেকটি সোহাগ আলী নামের এক ব্যক্তির হাতে পৌঁছায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাবিল আহসান দুদককে জানিয়েছেন, সোহাগ আলীকে তিনি চেনেন না এবং ওই ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধি নন।
বিভিন্ন ধাপে তুলে নেওয়া হয় টাকা
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি চেকটি সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের হিসাবে জমা দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন তারিখে ওই হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২ জানুয়ারি ৮০ লাখ টাকা এবং ৮ জানুয়ারি দুই দফায় ৮ লাখ ও ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এভাবে বিভিন্ন তারিখে পুরো ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয় বলে দুদকের অভিযোগ।
যেসব ধারায় মামলা
দুদকের এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।