নিজস্ব প্রতিবেদক।বর্তমান নিউজ
রংপুরে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন ও রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে নতুন সদর হাসপাতাল এবং জেলা পর্যায়ে একটি জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নতুন হাসপাতাল না থাকায় অতিরিক্ত রোগীর চাপে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে ব্যাহত হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা।
সচেতন মহলের মতে, প্রায় ৯৬ বছরের পুরোনো রংপুর সদর হাসপাতালটি সংস্কার করে পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন সদর হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ে একটি জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহলসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা সদর হাসপাতালটি এখন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। গত পাঁচ দশকে নতুন কোনো সরকারি হাসপাতাল গড়ে না ওঠায় রমেক হাসপাতালই এ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা। ফলে এক হাজার শয্যার হাসপাতালটিতে ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ রোগী চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন। রোগীদের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদেরও অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জানা যায়, ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর সদর হাসপাতাল একসময় স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তবে স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে হাসপাতালটির কার্যক্রম সংকুচিত হতে থাকে। ১৯৭৬ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হলে সদর হাসপাতালের কার্যক্রম আরও সীমিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে ভবনটি কখনো টিকাদান কেন্দ্র, কখনো সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, আবার কখনো রমেক হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। করোনা মহামারি শুরুর আগেও সেখানে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। বর্তমানে সেই কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর প্রাণকেন্দ্রে রংপুর সিটি করপোরেশনের বিপরীতে অবস্থিত সদর হাসপাতালের পুরোনো ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। একসময়ের লাল ভবনটি এখন ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। মূল ফটক বন্ধ থাকলেও দুই পাশে থাকা লোহার গ্রিল নেই। ভবনের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর-বিড়াল। পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে ভুতুড়ে পরিবেশ।
হাসপাতালের পাশের বাসিন্দারা জানান, ভবনের বিভিন্ন দরজা-জানালা খুলে নিয়ে গেছে চোরেরা। চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড়। সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায়। কখনো কখনো দিনের বেলায় চলে জুয়া খেলা। ভবনের প্রবেশপথের ওপরের অংশে এখনো ‘সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ’ লেখা থাকলেও সেখানে কোনো চিকিৎসা কার্যক্রম চালু নেই।
এদিকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় রমেক হাসপাতালে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিদিন হাসপাতালটির বহির্বিভাগে দুই থেকে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। অন্যদিকে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী। এক হাজার শয্যার এ হাসপাতালে শয্যা অনুযায়ী জনবল রয়েছে মাত্র ৬৫০ শয্যার সমপরিমাণ। ফলে ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপে ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা পরিবেশও।
এ ছাড়া নগরীর পশ্চিম প্রান্তে রমেক হাসপাতালের অবস্থান হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীদের সেখানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে। বিশেষ করে যানজটের কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে স্বজনদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। যানজটে আটকে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ পরিস্থিতিতে নগরবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রংপুর সদর উপজেলায় নতুন হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট রংপুরের সিভিল সার্জন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে রংপুর মহানগরীর বাইরে, তবে জেলা সদরের মধ্যে ঈশ্বরপুর ও হরিদেবপুর মৌজায় ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত জায়গায় ২৫০ শয্যার জেলা বা সদর হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়।
তবে একাধিকবার চিঠি দেওয়ার পরও হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাদের প্রত্যাশা, রংপুরের ক্রমবর্ধমান চিকিৎসাসেবার চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এবং নতুন হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে রোগীদের দুর্ভোগ কমাবে।