নিজস্ব প্রতিবেদক।বর্তমান নিউজ
ধান, চাল ও শাকসবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত নওগাঁয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দামের চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। আগাম জাতের শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও সরবরাহ কম থাকায় গত এক সপ্তাহে বেশির ভাগ সবজির দাম বেড়েছে। পাশাপাশি গত ১৫ দিনে চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়তি। এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) নওগাঁর সিএ অফিস খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি ফুলকপি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা, পটল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, শিম ১১০ থেকে ১২০ টাকা, করলা ৭৫ থেকে ৮০ টাকা এবং শসা ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া টমেটো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, গাজর ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, বরবটি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মুলা ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং মিষ্টিকুমড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ফুলকপি, বেগুন, শিম, করলা, শসা, বরবটি, কাঁচা মরিচ ও মিষ্টিকুমড়ার দাম বেড়েছে। তবে এ সময়ে টমেটোর দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং গাজরের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা কমেছে। পটল ও মুলার দামেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বেড়েছে চাল ও নিত্যপণ্যের দাম
গত ১৫ দিনে পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি চালের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারে স্বর্ণা-৫ চালের দাম কেজিতে ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ থেকে ৫১ টাকা হয়েছে। কাটারিভোগ চাল ৭৭ থেকে ৭৮ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ৮২ টাকা এবং জিরাশাইল চাল ৩ টাকা বেড়ে ৬৯ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। গত ১৫ দিনে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ১০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে। রসুন ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা, সয়াবিন তেল ৫ টাকা বেড়ে ২০৫ টাকা এবং মসুর ডাল ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
চড়া মাছ-মাংসের বাজারও
সবজি ও চালের পাশাপাশি মাছ-মাংস কিনতেও বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম বেড়ে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা হয়েছে। সোনালি মুরগির দাম ২৬০ থেকে ২৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০০ থেকে ৩১০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে লেয়ার মুরগির দাম কিছুটা কমে ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা থেকে ৩০০ থেকে ৩১০ টাকায় নেমেছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকায়।
সরবরাহ কম থাকায় বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের মাছের দামও। বর্তমানে প্রতি কেজি সিলভার কার্প ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, দুই কেজি ওজনের রুই ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, মৃগেল ২১০ থেকে ২২০ টাকা, দুই কেজি ওজনের কাতলা ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং পাঙাশ ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় মাছগুলোর দাম কেজিতে প্রায় ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম ক্রেতাদের
বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। সিএ অফিস খুচরা বাজারের ক্রেতা এস এম ফিরোজ হোসেন বলেন, তিন-চার দিন আগে তিনি ৬০ টাকা কেজি দরে বেগুন কিনেছিলেন। অথচ এখন সেই বেগুন কিনতে হচ্ছে ৮০ টাকায়। শিম ও ফুলকপিসহ অন্যান্য সবজির দামও বেশি। নির্ধারিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে বাড়তি দামের কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাঁকে।
আরেক ক্রেতা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, মাছ-মুরগির দাম এত বেড়েছে যে কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। গরুর মাংস অনেক আগেই তাঁর বাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। গত সপ্তাহে ১৬০ টাকা কেজি দরে কেনা ব্রয়লার মুরগি এখন ১৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আর সহজে কমে না।
রিকশাচালক সোহরাব আলী বলেন, রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন যে আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালাতে হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব
সিএ অফিস খুচরা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী তোরাব আলী বলেন, কয়েক দিন আগে বাজারে সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় দাম তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু গত তিন-চার দিন ধরে সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি সবজি ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে সবজির দাম কমতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মুরগি ব্যবসায়ী উজ্জ্বল হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। আগে একটি গাড়ির ভাড়া ২ হাজার টাকা দিতে হলেও এখন দিতে হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। এ ছাড়া মুরগির খাদ্যের দামও বেশি। ফলে সব মিলিয়ে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুরগি বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রেয়ান অভিযোগ করেন, মিল মালিকেরা সিন্ডিকেট করে প্রতি বস্তা চালের দাম ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা বেশি নিচ্ছেন। বেশি দামে চাল কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
দাম কমার আশ্বাস কৃষি বিপণন কর্মকর্তার
বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নওগাঁ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বিপণন কর্মকর্তা সোহাগ সরকার বলেন, শীতকালীন সবজির সরবরাহ কম থাকায় বর্তমানে দাম কিছুটা বেশি। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে সবজির দাম কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। মাছ ও মুরগির দামও পর্যবেক্ষণ করা হবে। অতিরিক্ত দাম নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে নওগাঁর বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও চাল, সবজি, মাছ-মাংস ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেট সামলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।