নিজস্ব প্রতিবেদক | বর্তমান নিউজ
বরিশাল বিভাগে ৮৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জরাজীর্ণ এসব ভবনে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে হাজারো শিক্ষার্থী। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও দেয়ালে ফাটল, আবার কোনো ভবনের ছাদ থেকে বেরিয়ে এসেছে রড। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উদ্বেগে রয়েছেন অভিভাবকেরাও।
বরিশাল নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকার এনায়েত উল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির পাঠদান চলাকালে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে তিন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহান জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে এ ঘটনা ঘটে। এর আগ থেকেই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও এখন পর্যন্ত সংস্কার করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়েই চলছে পাঠদান।
বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৮৭১টির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব ভবন সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হলেও অনেক বিদ্যালয়ে এখনো কাজ শুরু হয়নি।
জেলাভিত্তিক হিসাবে, বরিশালে সবচেয়ে বেশি ৩২০টি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া পিরোজপুরে ১৯৯টি, বরগুনায় ১৩২টি, ভোলায় ১১৫টি, ঝালকাঠিতে ৮৫টি এবং পটুয়াখালীতে ২২টি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলার ছানিকেদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের পর থেকে ভবনটির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। দীর্ঘদিনের অবহেলায় অবকাঠামো নাজুক হয়ে পড়েছে। দ্রুত সংস্কার কিংবা নতুন ভবন নির্মাণ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল সদর উপজেলার ৭৮ নম্বর আদর্শ মাতৃমন্দির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মিন্টু কুমার কর জানান, প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সংস্কার করা হয়নি।
ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা জানান, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখন ছাদের পলেস্তারা কিংবা ভবনের কোনো অংশ ধসে পড়ে, সেই আতঙ্ক বিরাজ করে। তাঁরা দ্রুত ভবন সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে এখনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। কোথাও শ্রেণিকক্ষ ও আসবাবপত্রের সংকট রয়েছে, আবার বর্ষা মৌসুমে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করে শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমবে।
বরিশাল জেলা শিক্ষা প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব বিদ্যালয়ের সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না অভিভাবকদের। দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার এবং নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।