
সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার প্রতীক নয়, কোনো ব্যবসার মাধ্যমও নয়। এটি একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা, যার মূল লক্ষ্য সত্য উদঘাটন, জনস্বার্থ রক্ষা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা জনগণের আস্থা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো নারায়ণগঞ্জেও সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনকি বিভিন্ন অপরাধে সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের নামও মাঝে মাঝে আলোচনায় আসে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্যই কলঙ্কজনক।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি—কয়েকজনের অপকর্মের দায় কখনোই পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আজও অসংখ্য পেশাদার সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতি, অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেকেই হুমকি, মামলা, হামলা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করছেন। তারাই প্রকৃত সাংবাদিকতার মুখ।
বর্তমান বাস্তবতায় সাংবাদিকতা পেশায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য। সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহারে স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা, নৈতিক আচরণবিধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অপরাধ, চাঁদাবাজি, মাদক, প্রতারণা বা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তবে তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচার্য হওয়া উচিত।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পেশার মর্যাদা রক্ষায় আরও সক্রিয় হতে হবে। কে প্রকৃত সাংবাদিক আর কে শুধুই পরিচয়পত্রের আড়ালে ব্যক্তিস্বার্থে সক্রিয়—সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মালিকদেরও যোগ্যতা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সত্যনিষ্ঠ, সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি। তাই সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় প্রকৃত সাংবাদিক, গণমাধ্যম, সাংবাদিক সংগঠন, প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
সাংবাদিকতার পরিচয় নয়, সততা, নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারই হোক একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয়।